
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার কালিগঞ্জে উৎসব মুখোর পরিবেশে ৩ দিনব্যাপী দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ নৌকা বাইচ উৎসব চলছে। এ নৌকা বাইচ স্থানীয়দের কাছে বিল বাঘিয়ার নৌকা বাইচ হিসেবে পরিচিত। যা প্রতি বছরের মতো এ বছরও নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার মানুষের মিলন মেলা বসেছে।
সোমবার (১০ অক্টোবর) দুপুর থেকে এ নৌকা বাইচ অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে। ৩ দিনব্যাপী এ নৌকা বাইচ আগামীকাল বুধবার সন্ধ্যায় সমাপ্ত হবে।
প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যে লালিত দু’শ বছরের এ নৌকা বাইচে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, পিরোজপুর, নড়াইল, বরিশাল জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের দু’ শতাধিক সরেঙ্গা, ছিপ, কোষা, চিলাকাটা, জয়নগর বাচারী নৌকা অংশ নেয়।
গ্রাম বাংলার অতি প্রাচীন এ নৌকা বাইচ ধরে রাখতে হাজারো প্রাণের আনন্দ উচ্ছালতায় কোটালীপাড়া উপজেলার বিল বাঘিয়ার বাবুর খালে কালিগঞ্জ বাজার থেকে খেজুরবাড়ি পর্যন্ত ২ কি:মি: এলাকা জুড়ে নৌকা বাইচ ও মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবের আমেজে এ নৌকা বাইচ শুরু হয়। যেখানে বিভিন্ন বয়সের মানুষ খালের দু’পাড়ে দাঁড়িয়ে নৌকা বাইচ দেখেন। নৌকাগুলোকে বিচিত্র সাজে সজ্জিত করা হয়েছে।
ঠিকারী ও কাঁশির বাদ্যের তালে জারি সারি গান নেচে গেয়ে হেঁইও হেঁইও রবে বৈঠার ছলাৎ- ছলাৎ শব্দে এক অনবদ্য আবহ সৃষ্টি হয়। দু’ কূলে দাড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মানুষের হৃদয়ে দোলা জাগে। সে সময়ে বাইচের নৌকার মাল্লাদের উৎসাহ দেয় তারা। পুরো এলাকায় উৎসবের আমেজ মুখোরিত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কোটালীপাড়ার জীবন জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল নৌকা। প্রায় দু’শত বছর আগে লক্ষ্মী পূজার সময় নৌকা নিয়ে এলাকার মানুষ জমিদার শিবরাম চৌধুরীর বাড়িতে যেতেন। সে সময়ে পূজা দেখে ফেরার সময় নৌকায় নৌকায় পাল্লা হতো। নৌকার মাধ্যমে চিত্তবিনোদনের চিন্তা থেকে নৌকা বাইচের প্রচলন শুরু হয়। সেই থেকেই লক্ষ্মী পূজার পরের দিন থেকে সেই এলাকায় নৌকা বাইচ উৎসব হয়ে আসছে।
কোটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ইসলাম বাদল বলেন, ছোট বেলা থেকে এ নৌকা বাইচ দেখে আসছি। এখানে কখনোই কাউকে বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে বাইচের আয়োজন করতে হয় না। মাঝি মাল্লারা নৌকা নিয়ে এসে নৌকা বাইচ উৎসব করে আসছে। এখানে কোন আয়োজক কমিটি নেই। কোন পুরস্কারের আয়োজন করা হয় না। যা ২০০ বছর ধরে এ নৗকা বাইচ উৎসব চলছে।
নৌকা বাইচ দেখতে আসা এক দর্শনার্থী বলেন, জীবনে অনেক স্থানের নৌকা বইচ দেখেছি। তবে এখানকার মতো এত বড়, কালার ফুল ও রাজকীয় ঢং এর নৌকা বাইচ আমি দেখিনি।
উপজেলার কদমবাড়ী গ্রামের এক বাইচার বলেন, আমরা ৩ দিনের নৌকা বাইচ উৎসবে অংশ নিয়ে দর্শনার্থীদের আনন্দ দেই। আমরাও আনন্দ উপভোগ করি। শত শত বছর ধরে আমাদের পূর্ব পুরুষরা এই উৎসবে অংশ নিয়ে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে। যা আমরা সেই ধারবাহিকতা ধরে রেখেছি। যা পরবর্তী প্রজন্মও এটি ধরে রাখবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, কোটালীপাড়া উপজেলার বাঘিয়ার বিলের নৌকাবাইচ আমাদের কৃষ্টি কালচার। এখানে গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার মানুষ নৌকাবাইচ উপভোগ করতে আসে। যে কারণে দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নৌকাবাইচ এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কোটালীপাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, নদী মাতৃক এ অঞ্চলের ২ শ’বছরের ঐতিহ্যবাহী বাঘিয়া বিলের নৌকা বাইচ টিকিয়ে রাখতে উপজেলা পরিষদ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল প্রকার সহযোগিতা করা হয়েছে।



