গ্যালারীটেকনোলজি

আসুন জেনে নিই ডিএসএল আর ও মিররলেস ক্যামেরার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো

একসময় ক্যামেরা বলতে আমরা শুধুই ডি এস এল আর ক্যামেরা বুঝতাম।কিন্তু বর্তমান ক্যামেরা বাজারের অনেকটাই দখল করে নিয়েছে মিররলেস ক্যামেরা।কি এই মিররলেস ক্যামেরা এবং ডি এস এল আর ও মিররলেস ক্যামেরার মধ্যে পার্থক্য কি, এ প্রশ্নের উত্তর
খুজছেন অনেকেই।আসুন জেনে নেই ডি এস এল আর ও মিররলেস ক্যামেরা এর মধ্যে পার্থক্য এবং ২০২২ সালে আপনার কোনটি কেনা উচিত সে সম্পর্কে বিস্তারিত।

ডি এস এল আর কথাটির অর্থ হলো ডিজিটাল সিঙ্গেল লেন্স রিফ্লেক্স ক্যামেরা। প্রত্যেকটা ডি এস এল আর ক্যামেরায় সেন্সরের কাছাকাছি স্থানে একটি মিরর বা আয়না থাকে। ছবি তোলার সময় সাবজেক্ট এর ওপর থেকে যে আলো ক্যামেরায় প্রবেশ করে , সেই আলো প্রথমে লেন্সের ভিতর দিয়ে একটা আয়নায় গিয়ে পড়ে।
সেই আয়নায় আলোর প্রতিফলন ঘটে এবং আলো আয়নার উপরে থাকা একটি প্রিজমে প্রবেশ করে। এরপর প্রিজমে আলোর পুনঃ প্রতিফলন ঘটে এবং আলো ভিউফাইন্ডারে প্রবেশ করে। তখন সেই ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে ক্যামেরা কি দেখছে আমরা তা দেখতে পাই। এখানে একটি অসুবিধা হলো আমরা যদি ছবি
তোলার সময় এক্সপোজার বা শাটার স্পিড চেঞ্জ করি, তাহলে ভিউফাইন্ডারের মাধ্যমে সাথে সাথে সেটা দেখতে পাব না। ফলে বিষয়টা কিছুটা এমন দাঁড়াবে যে, আমরা ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে যেরকম দেখতে পেলাম, ছবি ক্লিক করার পর সম্পূর্ণ ভিন্নতর ফলাফল পেলাম। কিন্তু মিররলেস ক্যামেরা এ সমস্যা হয় না।
মিররলেস কথাটির অর্থ হলো মিরর বা আয়নাহীন। অর্থাৎ, মিররলেস ক্যামেরাগুলোতে কোনো আয়না থাকেনা। এখন প্রশ্ন হলো, আয়না যদি না থাকে তাহলে আমরা কিভাবে দেখব ক্যামেরা কি দেখছে। এখানে যে বিষয়টা জানা প্রয়োজন, মিররলেস ক্যামেরাগুলোতে আয়না থাকেনা সত্যি কিন্তু এটিতে ব্যবহার করা
হয় ইলেকট্রনিক ভিউফাইন্ডার টেকনোলজি। এটি ডি এস এল আর এর অপটিকাল ভিউফাইন্ডার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ছবি তোলার সময় আপনি ক্যামেরার সেটিংসে যা যা পরিবর্তন করবেন, সাথে সাথেই ই ভি এফ বা ইলেকট্রনিক ভিউফাইন্ডারে তা দৃশ্যমান হবে। অর্থাৎ, ভিউফাইন্ডারের দিক থেকে ডি এস এল আর থেকে
এগিয়ে থাকছে মিররলেস ।

ডি এস এল আর ও মিররলেস এর মধ্যে তুলনার পরবর্তী বিষয়বস্তু হলো ফোকাস পয়েন্টস। আমরা যারা ফটোগ্রাফি করতে ভালোবাসি, তারা জানি ফোকাস পয়েন্টস কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি ক্যামেরার ফোকাস পয়েন্টস যত বেশি হবে, সেটির অটোফোকাস ক্যাপাবিলিটিও ততটাই ভালো হবে। অর্থাৎ, ক্যামেরা তত ভালোভাবে
সাবজেক্টকে অটোমেটিক ফোকাস করতে সক্ষম হবে। সাধারণত ডি এস এল আর ক্যামেরাগুলোর ফোকাস পয়েন্টস অনেক কম থাকে। বেশি ফোকাস পয়েন্টস পেতে চাইলে অনেক দামি ডি এস এল আর কিনতে হয়। এ দিক দিয়েও ডি এস এল আর এর চেয়ে একধাপ এগিয়ে থাকব এ মিররলেস ক্যামেরা। মিররলেস ক্যামেরার
ফোকাস পয়েন্টস সাধারণত ডি এস এল আর ক্যামেরার চেয়ে অনেক বেশি হয়। মজার ব্যাপার হলো, একটি এন্ট্রি লেভেলের মিররলেস ক্যামেরার ফোকাস পয়েন্টস একটি প্রোফেশনাল ডি এস এল আর ক্যামেরার চাইতেও বেশি হতে পারে। ভিডিও করার ক্ষেত্রে অটোফোকাস অনেক সুবিধাপুর্ন। সুতরাং, যে ক্যামেরার ফোকাস
পয়েন্টস বেশি থাকবে, সেই ক্যামেরার অটোফোকাস টেকনোলজি উন্নততর হবে। অর্থাৎ, সেই ক্যামেরা দিয়ে অত্যধিক ভালো মানের ভিডিও শুটিং করা যাবে। এ দিক বিবেচনায়ও ডি এস এল আর এর চেয়ে এগিয়ে থাকবে মিররলেস।

তুলনার পরবর্তী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু হলো লেন্স চয়েস। আপনি যতই ভালোমানের ও দামি ক্যামেরা কিনুন না কেন, লেন্স ভালোমানের না হলে ভালো ছবি তোলা যাবে না। যেহেতু, ডি এস এল আর টেকনোলজি অনেক আগে থেকে প্রচলিত, সেহেতু ডি এস এল আর ক্যামেরার জন্য প্রচুর লেন্স আজকের বাজারে
পাওয়া যায়। এবং, লেন্স গুলো তুলনামুলক কম দামেই পাওয়া যায়। অপরদিকে, মিররলেস ক্যামেরা একটি নতুন প্রযুক্তি হওয়ায় বাজারে বেশি পরিমাণে লেন্স সহজপ্রাপ্য নয়। আর মিররলেস ক্যামেরার লেন্সপগুলো সাধারণত অনেক দামি হয়ে থাকে, যা ক্রয় করা একজন বেগিনার লেভেলের ফটোগ্রাফার এর জন্য মোটেও
সহজ নয়। সুতরাং, লেন্সের সহজপ্রাপ্যতা ও দামের ক্ষেত্রে মিররলেস ক্যামেরাকে পেছনে ফেলেছে ডি এস এল আর।

আরেকটি যে বিষয় ডি এস এল আর ও মিররলেস ক্যামেরার মধ্যে পার্থক্যের মানদণ্ড দাঁড় করিয়ে দেয় তা হলো ব্যাটারি লাইফ। মিররলেস ক্যামেরা গুলো আকারে অনেকটাই ছোট এবং ইলেকট্রনিক ভিউফাইন্ডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ফলে মিররলেস ক্যামেরাগুলোর ব্যাটারি লাইফ খুব একটা বেশি পাওয়া যায়না। অর্থাৎ,
আপনি যদি সারাদিন ছবি তুলতে চান, তাহলে আপনাকে একাধিক ব্যাটারি পকেটে নিয়ে ঘুরতে হবে। অপরদিকে, ডি এস এল আর ক্যামেরাগুলো তুলনামুলকভাবে আকারে বড় হয় এবং এতে অপটিক্যাল ভিউফাইন্ডার টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়, যাতে ব্যাটারির কোনো অবদান নেই। সুতরাং, একটি ডি এস এল আর
ক্যামেরার ব্যাটারি লাইফ অনেক বেশি হয় এবং এক চার্জেই অনায়াসে সারাদিন ধরে ফটোগ্রাফি করা যায়। তবে এখানে একটি অসুবিধা হলো, মিররলেস ক্যামেরা গুলো সাধারণত স্মার্টফোনগুলোর মতো ইউ এস বি পোর্টের মাধ্যমে রিচার্জড হয়। ফলে আপনি ক্যামেরার সাথে আপনার ফোনের চার্জার প্লাগিন করে সরাসরি চার্জ করতে
পারবেন ব্যাটারি খোলা ছাড়াই। কিন্তু ডি এস এল আর ক্যামেরায় এই সুবিধা নেই। ডি এস এল আর ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জ করতে হলে, ক্যামেরার বডি হতে ব্যাটারি খুলে একটি আলাদা চার্জিং এডাপ্টার এর মাধ্যেমে চার্জ করতে হয়। ফলে আপনি বাইরে কোনো জায়গাইয় ছুটি কাটাতে গেলে আপনার ডি এস এল আর ক্যামেরার
ব্যাটারি চার্জ করতে অনেকটাই সমস্যায় পড়তে পারেন। কিন্তু মিররলেস ক্যামেরার ক্ষেত্রে এ সমস্যায় পড়তে হবে না।

আলোচনার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টপিক হলো, ২০২২ সালের শেষ দিকে দাঁড়িয়ে আপনার কোনটা কেনা উচিত, ডি এস এল আর নাকি মিররলেস। সিদ্ধান্তটা সম্পূর্ণই আপনার উপর নির্ভর করে। আপনি যদি একটি হালকা, কম্প্যাক্ট ও বহনে সুবিধাযোগ্য একটি ক্যামেরা চান, তাহলে আপনি মিররলেস ক্যামেরা কিনুন।
অপরদিকে, ক্যামেরা কি দেখছে সেটাই যদি আপনার কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে আপনি ডি এস এল আর কিনুন। এখানে যে কথাটা না বললেই নয় তা হলো, নিকন ,ক্যানন ও সনি এরকম অনেক বড় বড় ক্যামেরা কম্পানি ইতিমধ্যে তাদের ডি এস এল আর ক্যামেরা প্রোডাকশন বন্ধ করে দিয়েছে । অর্থাৎ, ভবিষ্যতে
তারা কোনো ডি এস এল আর ক্যামেরা বানাবে না। এসময়ে ডি এস এল আর কিনতে হলে কয়েক বছর আগের মডেল কিনতে হবে আপনাকে। অপরদিকে, মিররলেস ক্যামেরার অগ্রযাত্রা সবেমাত্র শুরু হয়েছে। প্রায় সকল ক্যামেরা কম্পানি মিররলেস ক্যামেরা পূর্ণদমে বানানো আরম্ভ করেছে। তাই বলা যায়, লেন্স কালেকশন
এবং ব্যাটারি লাইফ কম হলেও সুদূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মিররলেস ক্যামেরাই ক্রয় করা উচিত।

Related Articles